ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ সাল- কে বেশি শক্তিশালীঃ যন্ত্র নাকি মানুষ?

কি মনে হয়? এই লেখা শেষে কে জিতবে শক্তির তারতম্যে? আপনি নাকি এই মুহূর্তে যে ডিভাইসটির মাধ্যমে লেখাটি পড়ছেন, সেটি?

উত্তরটি আসলে যুগ পাল্টানোর সাথেসাথে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। কেননা আমরাই তৈরি করছি স্মার্ট ডিভাইসগুলো, আমরাই এটিকে আপডেট করছি এবং মানুষের সমতূল্য করার চেষ্টা করছি প্রতিনিয়ত। এর মানে হিউম্যান ব্রেইন যে পর্যন্ত গিয়ে অস্তিত্ত্বের খুটি বসাতে পারছে, ঠিক সেই যায়গায় মেশিনকেও নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মেশিনকে মানুষের মত চিন্তা করতে শেখানো এবং ডিসিশন নেয়ার ক্ষমতা প্রদান করার লক্ষ্যেই আসলে বর্তমান সময়ের এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, কম্পিউটার ভিশনের মত টার্মগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন জাগতেই পারেঃ যে টেকনোলজিকে আমরাই তৈরি করছি সেটার সাথে আবার হিউম্যান ব্রেইনের তুলনা কেন আসবে? তুলনার ব্যাপারটা কারোর মনে আসলেই আসতোনা, যদি না সাম্প্রতিক সময়ে গুগল-ডিপমাইন্ডের আলফাগো বর্তমান সময়ের গো গেইমের গ্রান্ড মাস্টার লে সেডলকে পরাজিত করতো। যদি না বছরের পর বছর ধরে শিখে আসা মানুষকে মাত্র ৪ ঘন্টা লার্নিং এর পরেই দাবা খেলায় পরাজিত করতো, তাহলে তুলনার ব্যাপারটা হয়তো আমিও আনতাম না।

– মানুষের সাথে মেশিন খেলছে

মূলত মেশিনের স্ট্রেন্থ হলো তার মেমোরি এবং একইভাবে হাজার হাজার ডিসিশন সঠিকভাবে ক্যালকুলেট করার ক্ষমতা। যেখানে মানুষের মেমোরি প্রাকৃতিকভাবেই অনুকরণপ্রিয় এবং স্টোরিং মেথড একটু ধীরগতির। আর হিউম্যান ব্রেইন অনেক্ষন সচল থাকার পর সেটি ক্লান্ত হয়ে একই ক্যালকুলেশন থেকে ভিন্ন ডিসিশন প্রদান করাটা খুবই স্বাভাবিক। সেদিক দিয়ে হিউম্যান ব্রেইন এখন পর্যন্ত আসলেও পিছিয়ে আছে।

কম্পিউটার এখানে মূলত তার মেমোরি স্টোরেজের এডভান্টেজটা নেয়। যার মাধ্যমে একটি ডিভাইস নিমিশেই অসংখ্য ইনফরমেশন তার মেমোরিতে স্টোর করে নিতে পারে। যার জন্য কিনা কম্পিউটারের কম্পিউটেশন, এনালাইজেশন, প্রেডিকশন এবং ডিসিশন নেয়াটা খুবই সহজ হয়, পাশাপাশি একটি মেশিন কোনো প্রকার ক্লান্তি ছাড়াই দিন-রাত একই কাজ নির্ভুল করতে পারে।

 

গত বছরের শেষের দিকে টেসলা প্রতিষ্ঠাতা এলন মাস্ক এবং ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের টুইট যুদ্ধের কথা আমরা অনেকেই জানি। তারা তো ভার্চুয়ালি একজন আরেকজনকে পাগল আখ্যা দিতেও পেছপা হননি। তাদের বার্তা ছুড়াছুড়ির মূল বিষয়টি ছিল- আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলজেন্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে, এটি বুদ্ধিবৃত্তির দিক দিয়ে মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে কিনা। এর মানে বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যপী যারা প্রযুক্তির নাটাই নাড়াচ্ছেন, তাদের মধ্যেও সংকা-সন্দেহের শেষ নাই।

– মার্কের টুইট বার্তায় এলন মাস্কের প্রতিউত্তর

তাদের ভবিষ্যৎবানী বা বড় বড় চিন্তাভাবনার কথা নাহয় বাদই দিলাম। বর্তমানে কি হচ্ছে?

২০০০ সালের করা একটা পরিসংখ্যানে সম্পূর্ণ ইন্টারনেটের যে কমপ্লেক্সিটি তার সাথে হিউম্যান ব্রেইনের তুলনা করা হয়। এবং সারপ্রাইজিংলি তখনকার সময়েই কম্পিউটার ব্রেইনের একটিভিটিই বেশি স্মার্ট বলে বিবেচিত হয়। এছাড়া স্কয়ার রুট, প্যারালাল প্রসেসিং এবং ইনফরমেশন সর্টিং এর ক্ষেত্রেও মেশিন অনেক ফাস্টার। এবং বর্তমানে মানুষের চেয়ে কম সময়ে মেশিন ক্যাট-ডগ ক্লাসিফাই করছে, একটি ইন্টারেস্টিং জোক বলে ফেলছে এমনকি ধারনা করা হচ্ছে- ২০৪০ সালের মধ্যে সকল ব্যাপারে মানুষের চেয়ে বেশি চিন্তাশক্তিসমৃদ্ধ মেশিন তৈরীতে বিজ্ঞানিরা সক্ষম হবে।

আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাই, অনেক ব্যাপারেই মেশিনের চিন্তাভাবনা মানুষের চেয়ে এখন পর্যন্ত অনেক অংশে এগিয়ে আছে। অনেক জায়গায় মানুষের চেয়ে সঠিক এবং নির্ভুল ক্যালকুলেশন অনেক কম সময়ে যন্ত্র আমাদের করে দিচ্ছে। কিন্তু, সেই কাজগুলো ফিল্ড স্পেসিফিক। একটি মেশিন শুধুমাত্র ঐ নির্দিষ্ট কাজের জন্যই মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান হতে পারে। এর বাইরের জগৎ সম্পর্কে সে কিছু জানেনা। অর্থ্যাৎ তাকে যা সেখানো হয়, সেটা থেকেই ডিসিশন নিতে পারে।

যেমন ধরা যাক- মানুষের হাতের লেখা বুঝার ক্ষেত্রে অনেকের লেখাই আছে যেগুলো রিকগনাইজ করতে মানুষেরই ঘাম ঝড়ে যায়, এমনকি আমরা ভুল প্রেডিকশনও করে থাকি। নিচের দুটি ক্যারেকটার লক্ষ্য করি-

MNIST ডেটাসেট থেকে ডিজিট রিকগনিশন

হিউম্যান আই-এ ক্যারেকটার দুটিকে ইংরেজিতে ২ মনে হতে পারে। কিন্তু মেশিন সেটাকে ৭ হিসেবে রিকগনাইজ করেছে। এখানে আসালে মেশিনই সঠিক। কারন মানুষের চোখে অনেক কিছু দেখতে দেখতে, সে কোনো একটা সংখ্যার দিকে বায়াস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মেশিনকে হাজার হাজার ডেটা দিয়ে শেখানোর পরে, সে পিক্সেল ক্যালকুলেট করে নিমিশেই দেখে নিয়েছে- ছবিটির সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে ৭ ডিজিটটির সাথে। যেখানে হিউম্যান আই এত নিখুত পর্যবেক্ষন এবং ক্যালকুলেশন করতে অনেক সময়ই সক্ষম হয়না। একটা হিউম্যান ব্রেইনে নিউরণ প্রতি সেকেন্ডে মোটামুটি ২০০ বার ফায়ার করতে পারে, অর্থ্যাৎ এর শক্তি ২০০ হার্টজ। যেখানে বর্তমানে কম্পিউটার প্রসেসর পরিমাপ করা হয় গিগাহার্টজ দিয়ে, অর্থ্যাৎ বিলিওনস সাইকেল প্রতি সেকেন্ডে।

কিন্তু এই কম্পিউটার ব্রেইনটাকেই যদি অন্য কাজে ইউজ করা হয়, বা নতুন কোনো সিনারিও থেকে ডিসিশন দিতে বলা হয় তাহলে পুরোপুরি অক্ষম হবে। এমনকি একটা কম্পিউটার প্রসেসরের এনার্জি এফিসিয়েন্সি একটা হিউম্যান ব্রেইনের চেয়ে প্রায় ১০০,০০০ গুন কম।

 

পরিশেষে এটাই সত্য, মহান সৃষ্টিকর্তার তৈরি এই মানব মষ্তিস্ক নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং সার্বিক দিক বিবেচনা করলে বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। কিন্তু স্পেসিফিক কোনো কাজের ক্ষেত্রে চিন্তা করলে কম্পিউটার ব্রেইন অনেক ক্ষেত্রেই হিউম্যান ব্রেইনের চেয়ে এগিয়ে আছে।

এখন আমাদের মত সাধারণ মানুষের শুধু দেখার পালা, প্রযুক্তির এই যাত্রা কোথায় গিয়ে শেষ হয়.. এগিয়ে যাক প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের অবিকল মস্তিস্ক বানানোর প্রচেষ্টা, বাড়তে থাকুক “কে বেশি শক্তিশালী” টাইপের বিতর্ক। তাহলেই বুঝতে পারবো- হ্যা আমরা সফল হচ্ছি আর ফলশ্রুতিতে পাচ্ছি মানুষের সহজ এবং ডায়নামিক জীবনযাপন।